গ্যাস সংকটে চট্টগ্রামে বন্ধ হচ্ছে গার্মেন্টস ও শিল্পকারখানা, গভীর হচ্ছে উৎপাদন সংকট
চট্টগ্রাম জেলা প্রতিনিধি মোঃ রুহুর আমিন :
তীব্র গ্যাস সংকটে চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের অচলাবস্থা। পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ না থাকায় অনেক গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, নিটিং, ডাইং ও প্রিন্টিং কারখানায় উৎপাদন কমে গেছে। কোথাও কোথাও উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন কারখানা মালিকরা। এতে একদিকে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয় ও আর্থিক ক্ষতি, অন্যদিকে রপ্তানি আদেশ ও শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিয়েও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চট্টগ্রামের বায়েজিদ, অক্সিজেন ও কালুরঘাটসহ বিভিন্ন শিল্প এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় ছোট ও মাঝারি আকারের বহু পোশাক, বস্ত্র, সুতা ও এক্সেসরিজ কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে গ্যাসনির্ভর নিটিং, ডাইং, প্রিন্টিং ও কম্পোজিট টেক্সটাইল কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে।
বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকগুলোও স্বাভাবিক সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। কোথাও উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। দীর্ঘ সময় মেশিন বন্ধ থাকায় উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রপ্তানি পণ্য নির্ধারিত সময়ে সরবরাহ করা নিয়েও তৈরি হয়েছে শঙ্কা।
গ্যাসের অভাবে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়
কারখানা সচল রাখতে কিছু প্রতিষ্ঠান বিকল্প জ্বালানি হিসেবে এলপিজি ব্যবহারের চেষ্টা করছে। তবে এতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা এবং রপ্তানি আদেশ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছেন শিল্পসংশ্লিষ্টরা।
শিল্প উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। উৎপাদন ব্যাহত হলে শুধু কারখানা মালিক নয়, শ্রমিক, সরবরাহকারী, পরিবহন খাতসহ সংশ্লিষ্ট পুরো সরবরাহব্যবস্থায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
রপ্তানি ও কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ
চট্টগ্রামের শিল্পখাতের একটি বড় অংশ পোশাক ও বস্ত্র উৎপাদন এবং রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত। গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করা নিয়ে উদ্যোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। দীর্ঘমেয়াদি সংকট হলে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা ও ভবিষ্যৎ রপ্তানি আদেশেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে উৎপাদন কমে যাওয়ায় শ্রমিকদের নিয়মিত কাজ ও ওভারটাইম কমে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। দেশের অন্যান্য শিল্পাঞ্চলেও গ্যাস সংকটের কারণে শ্রমিকদের আয় কমে যাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
চট্টগ্রামে গ্যাসের চাহিদা-সরবরাহে বড় ঘাটতি
সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চট্টগ্রামে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৭০ মিলিয়ন ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে জাতীয় গ্রিড থেকে প্রায় ২৫০ থেকে ২৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেলেও সাম্প্রতিক সময়ে সরবরাহ কমে প্রায় ১৯০ থেকে ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। ফলে শিল্পকারখানাগুলোতে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এদিকে মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গ্যাস সংকট আরও তীব্র হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। টার্মিনালটি পুনরায় চালু হওয়া এবং নতুন এলএনজি কার্গো আসার মাধ্যমে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির আশা করা হচ্ছে।
দ্রুত সমাধানের দাবি
শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, চট্টগ্রামের শিল্পখাতকে সচল রাখতে দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে গ্যাস সংকটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে চট্টগ্রামের শিল্পকারখানায় উৎপাদন আরও কমে যাওয়ার পাশাপাশি রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

